নিজস্ব প্রতিবেদক: প্যারিস জলবায়ু চুক্তি গ্রহণের এক দশক পরও বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নীতি ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের ব্যবধান রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ রেকর্ড ৫৭ দশমিক ৭ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্যে (CO₂e) পৌঁছেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে ন্যায়বিচার, ঋণমুক্ত সহায়তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং ক্ষতি ও ক্ষয় মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করার দাবি সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, নদী অববাহিকা ও শহরাঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ার মধ্যেও বাংলাদেশকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি ৩.০-তে ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিজস্ব তহবিল থেকে ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি লক্ষ্য অর্জনে ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক শর্তাধীন সহায়তা প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে ন্যায়বিচারের দাবি
আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৌশলগত দাবি হিসেবে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা কেবল আর্থিক চাহিদা নয়; বরং জলবায়ু মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতারও পরীক্ষা।
নতুন সমষ্টিগত পরিমাণগত লক্ষ্য বা নিউ কালেক্টিভ কোয়ান্টিফায়েড গোল (এনসিকিউজি)-এর আওতায় জলবায়ু অর্থায়ন শতভাগ অনুদানভিত্তিক, ঋণমুক্ত, পূর্বাভাসযোগ্য এবং অতিরিক্ত অর্থায়ন হিসেবে নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে অভিযোজন ও নিঃসরণ হ্রাসের জন্য বাণিজ্যিক ঋণ নিতে বাধ্য করা হলে তা তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য সরাসরি অর্থায়নে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এতে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের জটিলতা কমার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতিকে বাংলাদেশের জাতীয় ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি পূরণে ঘাটতি হিসেবে বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও শূন্য-বর্জ্য নীতিতে গুরুত্ব
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
কপ৩১-এ জাস্ট ট্রানজিশন ওয়ার্ক প্রোগ্রামকে বাস্তবায়নমুখী করতে বেলেম অ্যাকশন মেকানিজম (বিএএম) পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার দাবি তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন ঋণের বোঝা সৃষ্টি না করে বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে মিথেন নিঃসরণ ও শিল্পদূষণ কমাতে শূন্য-বর্জ্য বা ‘জিরো ওয়েস্ট’ নীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে শুধু বর্জ্যভূমি থেকে গ্যাস পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভর না করে বর্জ্যের উৎসে পৃথকীকরণ, কম্পোস্টিং এবং পরিচ্ছন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়া (আরইসিপি) জোরদার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতের অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক ও নারী কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ক্ষতি ও ক্ষয় মোকাবিলায় অনুদানভিত্তিক তহবিলের দাবি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে সংঘটিত ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে ক্ষতি ও ক্ষয় (লস অ্যান্ড ড্যামেজ) মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি ও ক্ষয় ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়। এ ছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কপ৩১-এ ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ (এফআরএলডি) দ্রুত পর্যাপ্ত অনুদানভিত্তিক অর্থায়নে সমৃদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিতে ক্ষুদ্র অনুদানের বিশেষ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
অভিযোজন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জলবায়ু পদক্ষেপে নারী ও তরুণদের অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান
জলবায়ু মোকাবিলায় অধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের অংশ হিসেবে বেলেম অ্যাকশন মেকানিজমের শাসন কাঠামোয় তরুণদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া জলবায়ু সহনশীল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নারীদের ভূমির অধিকার, তাঁদের কাজের স্বীকৃতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় নির্দিষ্ট অর্থায়ন নিশ্চিত করার প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শুধু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; সেই অর্থ দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে।
কপ৩১-কে আরেকটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির সম্মেলনে পরিণত না করে কথা ও কাজের ব্যবধান দূর করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর হাতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রয়োজনীয় সম্পদ ও অধিকার তুলে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।