জাহাঙ্গীর ইসলাম, বগুড়া প্রতিনিধি ।বগুড়ায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে নেয়া লকডাউনে প্রায় দেড় লাখ পরিবহন শ্রমিক কর্ম হারিয়ে কর্মহীন জীবনযাপন করছে। দেড় মাস ধরে তাদের কোনো আয় রোজগার নেই। বাড়িতে বসে আলস সময় কাটাচ্ছে এসব শ্রমিকরা। হাতে জমানো কিছু টাকা পয়সা ছিল তা শেষ। ফলে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি পবিত্র ঈদুল ফিতর পালন নিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভূগছেন শ্রমিকরা। জানা গেছে, জেলার কর্মহীন শ্রমিকদের মধ্যে সরকারি সাহায্য দু-একজন ১০ কেজি মোটা চাল পেলেও তা দিয়ে বেশিদিন সংসার চালাতে পারেননি। সরকার আগামী ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে। এ লকডাউনের পরিধি পুনরায় বৃদ্ধি হলে এসব শ্রমজীবী এসব মানুষদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাবে। তবে বগুড়ায় সরকারি সাহায্যেরও পরিমাণ বাড়ানো অব্যাহত থাকলেও এখনও বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ তা থেকে বঞ্চিত বলে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর ২৬ মার্চ থেকে দেশে সব ধরনের গণপরিবহন আগামী ৩০ মে পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে দেয় সরকার। বগুড়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পরিসংখ্যান সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত এক লাখ ৬৪ হাজার ৫’শ শ্রমজীবী। যারা করোনার প্রাদূর্ভাবে কর্মহীন হয়ে নানা প্রতিকুলতার মধ্যে জীবনযাপন করছে। তাদের মধ্যে জেলা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক রয়েছেন ১৩ হাজার, বাস-মিনি বাস শ্রমিক রয়েছেন ২৩ হাজার, সিএনজি ও অটোরিকশাা চালক ৭ হাজার, রিকশা ভ্যান ও ঠেলাগাড়িসহ অযান্ত্রিক সড়ক পরিবহন শ্রমিক ১৫ হাজার, হোটেল, বেকারি, ঢালাই ও লেদ শ্রমিক ১০ হাজার, দোকান ও প্রতিষ্ঠান কর্মচারি ৫ হাজার, ভাসমান শ্রমিক ১০ হাজার, ডেকোরেটর শ্রমিক এক হাজার, ফার্নিচার শ্রমিক ৩ হাজার, ইটভাটা শ্রমিক ৩০ হাজার, কুলি ৫ হাজার, নরসুন্দর (নাপিত) ২ হাজার ও মুচি ৫০০। এর বাইরেও দর্জি শ্রমিক, স্বর্ণ শ্রমিক, গৃহনির্মাণ শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন আরও অনেকেই। এর মধ্যে শুধু ১৩ হাজার ট্রাক শ্রমিক ট্রাক চালালেও বাকি দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক অতি কষ্টে দিনাতি করছেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এদের প্রায় সবাই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় তাদের পরিবারের খরচ চালাতে জমানো টাকা খরচ করতে হচ্ছে। কারও কারও ভাগ্যে যে সরকার বা বেসরকারি ত্রাণ জুটছে না, তা নয়। জুটলেও তা সীমিত শ্রমজীবী মানুষ পাচ্ছেন। শেরপুর উপজেলার গোশাইপাড়ার বিকাশ সাহা, স্বপন তাম্বলী, সুজিত সাহা বলেন, তাদের পরিবারের লোকসংখ্যা ৫ থেকে ৭ জন। সংসার চালানোর কর্তা হিসেবে ওইসব শ্রমিক। কিন্তু দেড় মাস ধরে গণ পরিবহনের চাকা বন্ধ। ধার দেনা করে সংসার চালালেও বর্তমানের ধারও কেউ দিচ্ছেনা। কিভাবে সংসার চালাবো এই ভাবনায় দিনাতিপাত করছে। শুধু এরাই নয় এভাবেই অতিকষ্টে দিন কাটাচ্ছে শেরপুর উপজেলার কয়েক হাজার বিভিন্ন ট্রেডের শ্রমিক। এমনই অভিমত ব্যক্ত করেন বগুড়া জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ,মাইক্রোবাস পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আরিফুর রহমান মিলন। বগুড়া সদর উপজেলার নামুজা এলাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক রোস্তম আলী জানান, সিএনজি চালু থাকাকালে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় হতো। এখন প্রায় ৫০ দিন ধরে সিএনজি চলাচল বন্ধ। এর মধ্যে সরকার থেকে ১০ কেজি চাল ছাড়া আরও কিছু পাননি। সামনে ঈদ। কিভাবে সংসার চলবে তাই ভাবছি। ধুনট পৌরসভার সরকারপাড়ার বাসিন্দা শাহিন ইসলাম বলেন। ঢাকা-বগুড়া একটি লোকাল বাসের সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি করেন। ৫ সদস্যের পরিবার তার। প্রায় দেড় মাস ধরে গাড়ি বন্ধ। আয় রোজগার কিছুই নেই। মাঝে তাকে পৌর মেয়র ১০ কেজি চাল ও ২ কেজি আলু দিয়েছেন। এ দিয়েই চলছে তার সংসার। সামনে ঈদ আসছে। ছেলে-মেয়ের জন্য কিছু হয়তো করতে পারবেন না। এটাই তার কষ্ট। এ ব্যাপারে বগুড়া জেলা জাতীয় শ্রমিকলীগ ও জেলা মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সামছুদ্দিন শেখ হেলাল বলেন, তাদের ইউনিয়নের নিবন্ধিত শ্রমিক সংখ্যা ২১ হাজার এবং এটি বগুড়া তথা এ অঞ্চলের বৃহত্তর শ্রমিক সংগঠন। এদের অধিকাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। যাদের পক্ষে মানুষের কাছে হাত পাতা সম্ভব নয়। আবার তাদের হাতে তেমন টাকা মজুদ ও থাকে না। এ দীর্ঘ সময় গাড়ি বন্ধ থাকায় তাদের জমানো টাকা শেষ হয়ে গেছে। ফলে তাদের খেয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, তার সাধ্যমতো এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিককে অর্থ ও খাদ্য সাহায্য করেছে। কিন্তু যা দিয়েছেন তা নিতান্তই অপ্রতুল। এজন্য তিনি সরকারি সাহায্যেও জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে তার ইউনিয়নের ২১ হাজার শ্রমিকের নামের একটি তালিকা জমা দিয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ বলেন, কর্মহীন শ্রমিকদের নামের তালিকা সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। তাছাড়া শ্রমিক ও কর্মহীন সাধারণ মানুষের জন্য কোন আলাদা বরাদ্দ নেই। সকল বরাদ্দ উপজেলা ও পৌরসভায় ভাগ করে দেয়া হয়। আর তৃণমূল পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলররা নিজেরাই তালিকা তৈরি করে তারাই তা বিতরণ করেন। এ প্রসঙ্গে বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঁঞা বলেন, বগুড়াসহ রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে অয়োজিত ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তিনি শ্রমিকদের এ দুঃখ দুর্দশার কথা তুলে ধরলে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন। তবে শ্রমজীবী কর্মজীবী মানুষ এভাবে দীর্ঘদিন কর্মহীন হয়ে থাকলে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়া অস্বাভাবিক নয়। যদিও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে ব্যাপক তৎপর রয়েছে বলে তিনি জানান।