দীর্ঘ পরীক্ষার জটের কারণে গেজেট দিয়ে সনদের দাবী শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের

প্রকাশিত: ৯:৪০ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

দীর্ঘ পরীক্ষার জটের কারণে গেজেট দিয়ে সনদের দাবী শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের

মামুন, ঢাকা :
গত ২১ শে জুলাই ২০১৭ ও ২৮ শে ফেব্রুয়ারী ২০২০ ইং তারিখে আইনজীবী তালিকাভুক্তিকরণ পরীক্ষার প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ শিক্ষানবিশবৃন্দ। গত ২৮ শে ফেব্রুয়ারী প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পর শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা যখন লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি ঠিক তখনই করোনা ভাইরাস জনিত বৈশ্বিক মহামারীর কারনে ১৭ই মার্চ থেকে দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হয় এবং এর প্রেক্ষিতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে কয়েক দফা এই ছুটি বৃদ্ধি করা হয় এবং সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ৬ই আগস্ট পর্যন্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও করোনা ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না, প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এমন পরিস্থিতি থেকে দেশ কবে মুক্তি পাবে সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা মুশকিল । এমন অবস্থায় অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য লিখিত পরীক্ষা অনিশ্চিত।

২০১৭ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারী ” বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বনাম দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি ” মামলার প্রদত্ত রায়ের নির্দেশনাতে আপিল বিভাগ বলেছিলো ” The Bar Council shall complete the enrollment process of the applicants to be enrolled as advocates in the district court each calendar year. ” কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আপিল বিভাগের এই নির্দেশনা দেওয়ার তিন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর নির্দেশনাটি কার্যকর করা হয়নি। উপরন্তু ২১ শে জুলাই ২০১৭ এর পর ২ বছর ৭ মাস পরে আরেকটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। এতো দীর্ঘ সময় পরে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা পারিবারিক – সামাজিক – আর্থিক চাপের মধ্যে আছে, তারসঙ্গে বর্তমান করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও লিখিত পরীক্ষা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার জন্য আমরা হতাশায় ভুগছে এবং তাদের জীবন বিতৃষ্ণ হয়ে উঠছে।

ইতিপূর্বে সর্বশেষ এনরোলমেন্ট পরীক্ষাটি শেষ হতে সময় লেগেছিলো ১ বছর ৫ মাস। বর্তমান করোনা মহামারী কবে নিরসন হবে সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। যারফলে, লিখিত পরীক্ষা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় যদি পরিস্থিতি বিবেচনা করে ২০১৭ ও ২০২০ সালে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা বাতিল করে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করা না হয় সেক্ষেত্রে আগামী ২০২১ সালেও বর্তমান এনরোলমেন্ট পরীক্ষার সম্পূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এরফলে পরীক্ষার জট আরো দীর্ঘায়িত হবে এবং আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী ২০২১ সালে আরেকটি এনরোলমেন্ট পরীক্ষার প্রসেস সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে বিষয়টি আদালত অবমাননা হয়।

বছরের পর বছর সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের অবমাননা আইনের ছাত্র হয়ে আমরা কখনোই প্রত্যাশা করি না। তাই ২০১৭ ও ২০২০ সালে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করার মাধ্যমে ২০২০ সালের মধ্যেই এনরোলমেন্ট প্রসেস সম্পন্ন করে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যেগ নেওয়া উচিৎ।
The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 এর Article 40(1) এবং 40(2)(m) অনুযায়ী গেজেট বা প্রজ্ঞাপন দ্বারা ২০১৭ ও ২০২০ সালে প্রিলিমিনারি উর্ত্তীর্ণদের সনদ প্রদান করতে কোনো বাধা নাই। এই বিষয়ে ” The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 ” এর Article (40)(1) এ বলা হয়েছে ” The Bar Council may, with the prior approval of the Government by notification in the official Gazette, make rules to carry out the purposes of this order, ” এবং Article 40(2)(m) বলা হয়েছে ” the examination to pass for admission as an advocate. ” উপরোক্ত দুইটি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ২০১৭ ও ২০২০ সালে প্রিলিমিনারি উর্ত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে পারেন।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কর্তৃক সর্বশেষ ২০১৮ সালে প্রণীত ভোটার তালিকা অনুসারে আইনজীবীর সংখ্যা ৪৩৮৮৪ জন। ২০১৭ সালের ২১শে জুলাই এনরোলমেন্ট পরীক্ষার প্রিলিমিনারি শুরু হলেও তা চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয় ২০১৮ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর, উক্ত তারিখে ৭৭৩২ জন আইনজীবী তালিকাভুক্ত হয়। দুটি সংখ্যা যোগ করলে দেশে মোট আইনজীবীর সংখ্যা হয় ৫১৬১৬ জন। এরই মধ্যে অনেক আইনজীবী মারা গেছেন তাই আমরা আইনজীবীর সংখ্যা ৫০ হাজার ধরতে পারি। এই ৫০ হাজার আইনজীবীর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি আইনজীবী নন প্র্যাকটিসনার। ১৭ কোটি জনসংখ্যা ও ৩৬ লক্ষ ৪০ হাজার মামলার জন্য এই স্বল্প সংখ্যক আইনজীবী অপ্রতুল।

উপরে উল্লেখিত আপিল বিভাগের রায়ের নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বর্তমান করোনা মহামারীর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবং ” The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972″ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা বাতিল করে ২০১৭ ও ২০২০ সালে প্রিলিমিনারি উর্ত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীবৃন্দকে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তি করে গেজেট প্রকাশ করে আইন পেশায় আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাটি ২০২০ সাল থেকেই কার্যকর করার জন্য ইতিমধ্যে সকল জেলার শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানববন্ধন ও স্বারকলিপি দিয়েছেন এবং মুজিব বর্ষ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির শিক্ষানবিশ আইনজীবী বোনা আসাদ বলেন,” আপীল বিভাগের রায় ২০১৭ সাল থেকে কার্যকর হলে আজকে আইজীবী থাকতাম ইনশাল্লাহ। দীর্ঘ ৩ বছর পর এম সি কিউ পরীক্ষা এবং বৈশ্বিক মহামারীর কবলে পড়ে এই বছরে আদৌ লিখিত পরীক্ষা হবে কিনা তা এখন সম্পূর্ণভাবে অনিশ্চিত। প্রিলি পাশ করেছি ৪ মাস হয়ে গেছে। দেশের এই পরিস্থিতিতে রিটেন কবে হবে আর তার রেজাল্ট কবে পাব আর কবে সনদ?
পুরো প্রসেস এখন অনিশ্চিত। আমি গ্রাডুয়েশন সম্পন্ন করে শুধুমাত্র পরীক্ষার জটের কারণে আজকে ৩ বছর বেকার!

বার কাউন্সিলের বিজ্ঞ এনরোলমেন্ট কমিটির কাছে বিনীত অনুরোধ এম সি কিউ উত্তীর্ণদের গেজেট নিয়ে সনদ দিয়ে অথবা লিখিত পরীক্ষা মওকুফ করে ভাইভা নিয়ে সনদ দিয়ে ২০২০ সাল থেকেই আপীল বিভাগের নির্দেশনা কার্যকর করে আমাদের বেকারত্ব থেকে মুক্তি দিক।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির শিক্ষানবিশ আইনজীবী মহিউদ্দিন মামুন বলেন আইন বিষয়ে অনার্স এবং মাস্টার্স শেষ করে ২০১৭ থেকে বসে আছি শুধুমাত্র আইনজীবী হবার সপ্ন নিয়ে এখন দেখছি বার কাউন্সিলের যাতাকলে পরে সেই সপ্ন আজ বিলিন হবার পথে। তিনি আরও বলেন আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী প্রতি বছর পরীক্ষার কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান বার কাউন্সিল কমিটির মেয়াদ শেষের পর্যায়ে থাকলেও একটি পরীক্ষাও সম্পন্ন করতে পারেন নাই, তাই বর্তমানে যারা এমসিকিউ পরীক্ষায় পাশ করেছেন তাদেরকে করোনা মহামারীর কথা বিবেচনা করে গেজেট করে সনদ দিয়ে বেকারত্ব দূরীকরণের ব্যাবস্থা করা হোক।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির আরো এক শিক্ষানবিশ আইনজীবী আইনুল ইসলাম বিশাল বলেন,
করোনা ভাইরাসের মহামারীর কারনে লিখিত পরীক্ষা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনিশ্চিত। তাই ২০১৭ ও ২০২০ সালে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা বাতিল করে আইনজীবী হিসেবে সনদ প্রদান করে হোক।

আইনের ছাত্র হিসেবে আমরা চাই, আপিল বিভাগের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রতি বছর এনরোলমেন্ট প্রসেস সম্পন্ন করার নির্দেশনা ২০২০ সালের এই মুজিব বর্ষ থেকেই কার্যকর করা হোক।


alokito tv

Pin It on Pinterest