আগৈলঝাড়ায় পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন পুরিয়ে ভাস্কর্য তৈরি বঙ্গবন্ধু’র ভাস্কর্য সহ নিজের সংগ্রহ শালায় রয়েছে শতাধিক ভাস্কর্য

প্রকাশিত: ৭:২৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২০

আগৈলঝাড়ায় পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন পুরিয়ে ভাস্কর্য তৈরি বঙ্গবন্ধু’র ভাস্কর্য সহ নিজের সংগ্রহ শালায় রয়েছে শতাধিক ভাস্কর্য

মোঃ জহিরুল ইসলাম সবুজ, আগৈলঝাড়া প্রতিনিধিঃ শখ থেকে প্রচার বিমুখ এই গুণী শিল্পী পরিবেশ দুষণকারী পরিত্যাক্ত পলিথিন পুরিয়ে তৈরী করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, সেবাদানের পথিকৃৎ মাদার তেঁরেসা, বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শেখ রাসেলসহ বিশিষ্ট জনের আকর্ষণীয় শতাধিক ভাস্কর্য। এছারাও নিজের মাথার উঠে যাওয়া চুল সংগ্রহ করে তা দিয়ে তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধুর মুখ মন্ডল সম্বলিত অপরুপ বাংলাদেশের মানচিত্র। এই শিল্পকর্মগুলো বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের রাহুৎপাড়া গ্রামের গৃহিণী এমিলিয়া রায়ের বানানো। নিজেকে শিল্পী নয়, বরং পরিবেশ বান্ধব সচেতন ব্যাক্তি মনে করেন প্রায় ৭০ বছর বয়সী এই নারী। গত ২০ বছর ধরে পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন গলিয়ে তৈরি করছেন ভাস্কর্য। বাদ যায় না তুলা ও পড়ে যাওয়া চুলের মতো ফেলনা জিনিস। আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তার শিল্পকর্ম ফুটে উঠেছে। এ পর্যন্ত শতাধিক শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা, কবিতা লেখা, গান গাওয়া ও নিজের লেখা গানে কন্ঠ দেয়ার প্রতি প্রচন্ড ঝোঁক ছিল এমিলিয়ার। এসএসসি পাশ করার পরেই বিয়ে হয় আলফ্রেড রায়ের সাথে। সংসার জীবনে ঢুকে লেখাপড়া থেমে গেলেও থেমে যায়নি তার উদ্ভাবনী ইচ্ছা শক্তি। বিয়ের পরে স্বামীর সংসারেও নতুন করে এমিলি শুরু করেন ছাত্রজীবনে তার সেই উদ্ভাবনীর বহিঃপ্রকাশ। দাম্পত্য জীবনে দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জননী এমিলিয়া রায়। স্বামী মারা যাবার পরে স্বাবলম্বী হওয়া ছেলে মেয়েদেরও দেখভাল’র সকল দ্বায়িত্ব নিয়েছেন প্রায় সত্তোর ছুই ছুই করা এমিলিয়া নিজেই। ১৯৯০ সালের কোন একদিন রান্না করা গরম কড়াই পাশের পলিথিন ব্যাগের উপর রাখায় পলিথিন ব্যাগ গলতে দেখে ওই পলিথিনের মাধ্যমেই নতুন করে উদ্ভাবনীর ইচ্ছে কড়া নাড়ে তার মনে। সেদিন থেকে পরিবারের ফেলে দেওয়া পলিথিন ব্যাগ বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে সংগ্রহ করে তা আগুনে পুড়িয়ে শুরু করেন ভাস্কর্য নির্মানের কাজ। নির্মান করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ভাস্কর্য, প্রায় ৮০কেজি ওজনের মাদার তেঁরেসার ভাস্কর্য। শিল্প দতা আর নিপুনতায়র ছোয়ায় পর্যাক্রমে তৈরী করেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর ভাস্কর্য। নিজের রাজনৈতিক দর্শনের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে নির্মান করেন মানবতার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাস্কর্য। ’৭৫ এর ১৫আগস্ট জাতির পিতার সাথে ঘাতকের বুলেটের সামনে দাড়িয়ে প্রাণপন বাঁচার আকুতি নিয়ে দাড়িয়ে থাকা শেখ রাসেলের ভাস্কর্য। নির্মান করেন মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীদের উপর ঝাপিয়ে পড়া পাকিস্তানী সেনা ও তাদের দোসরদের মাধ্যমে নির্যাতনের এতিহাসিক ভাস্কর্য। ছোট বড় মিলে অন্তত শতাধিক ভাস্কর্য রয়েছে তার নিজের সংগ্রহ শালায়। সব মিলিয়ে বাড়িটি যেন এক ভাস্কর্য শিল্পের নিদর্শন। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত কারণে শারীরিক অসুস্থতায় তেমন হাঁটা চলায় সমস্যা হলেও থেমে নেই তার শিল্পকর্ম নির্মাণের কাজ। নিরলসভাবে নির্মাণ করে চলেছেন ভাস্কর্য। শুধু পরিবেশ বিরুপ পলিথিন দিয়ে ভাস্কর্য নির্মানই নয় গুনী শিল্পী এমিলিয়া তুলা দিয়ে আঁকা ছবির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের বিভিষীকাময় দৃশ্যগুলো। এছারাও নিজের মাথার উঠে যাওয়া চুল সংগ্রহ করে তা দিয়ে তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধুর মুখ মন্ডল সম্বলিত অপরুপ বাংলাদেশের মানচিত্র। শিল্পী এমিলিয়া রায় জানান, শেষ জীবনে তার ইচ্ছা নিজের হাতে তৈরী করা ভাস্কর্যগুলো মমতাময়ী মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেয়া। কিন্তু সকল ভাস্কর্য প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও ঘাতকের বুলেটে নির্মম হত্যার শিকার হওয়ার আগে শেখ রাসেলের বাঁচার আকুতিভরা নিপুন ভাস্কর্যটি নিজের কাছেই রাখতে চান তিনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার তিন বছরের ছেলে তিনু রায় অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের অভাবে বিনা চিকিৎসায় চোখের সামনে ধুকে ধুকে মারা যায়। শেখ রাসেলের আকুতিভরা ভাস্কর্যর মধ্যে তিনি খুঁজে পেতে চান নিজের হারানো ছেলে তিনুকে। তিনি আরও বলেন, ‘ভাস্কর্য তৈরির চেয়ে আমার প্রধান ল্য ছিল পরিবেশদূষণ দূর করা। বিভিন্ন রঙের পলিথিন পুড়িয়ে সেখান থেকে রঙের সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ভাস্কর্য তৈরি করেছি। এটি সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে পলিথিনের দূষণের হাত থেকে আমরা কিছুটা হলেও মুক্তি পাবো। কারণ পলিথিন সহজে পচনশীল নয়। নিজের বয়সের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’


alokito tv

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Pin It on Pinterest