
নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা: ক্যানসার, কিডনি রোগসহ সাতটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসার জন্য এককালীন এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেবে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় ৬৫ হাজার রোগীকে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তর এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। সরকারি এ সহায়তা পেতে রোগী নিজে অথবা তাঁর পরিবারের সদস্য, অভিভাবক কিংবা আইনগত প্রতিনিধি অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন। তবে আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে মনোনীত রোগীরাই এ অনুদান পাবেন।
যে সাত রোগে মিলবে এক লাখ টাকা
সরকারের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় সাতটি রোগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রোগগুলো হলো—
১. ক্যানসার
২. কিডনি রোগ
৩. লিভার সিরোসিস
৪. প্যারালাইসিস
৫. হৃদ্রোগ
৬. লিউকেমিয়া
৭. থ্যালাসেমিয়া।
এসব রোগে আক্রান্ত দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সহায়তা করাই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।
কারা পাবেন এ সহায়তা?
আবেদনকারীকে বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে। রোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আবেদনকারীর পরিবারের আয়, ব্যয় ও সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে আবেদন যাচাই করা হবে।
নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী, একজন রোগী একই অর্থবছরে একবার এবং সারা জীবনে সর্বোচ্চ তিনবার এ আর্থিক সহায়তা পেতে পারবেন। তবে সহায়তা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন।
আবেদনে যেসব কাগজপত্র লাগবে
আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
– রোগীর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি।
– অপ্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদের ফটোকপি।
– প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আবেদনকারী বা অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি।
– পাসপোর্ট সাইজের এক কপি ছবি।
– নমিনির প্রয়োজনীয় তথ্য।
– রোগী, আবেদনকারী বা অভিভাবকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য।
– ব্যাংকের চেকবইয়ের কভার পাতার ফটোকপি।
– চিকিৎসকের সর্বশেষ ব্যবস্থাপত্রের ফটোকপি।
– রোগ শনাক্তকরণ-সংক্রান্ত পরীক্ষার রিপোর্টের সত্যায়িত কপি।
রোগের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত পরীক্ষার রিপোর্টও জমা দিতে হবে।
রোগভেদে যেসব পরীক্ষার রিপোর্ট প্রয়োজন
ক্যানসার: টিস্যু ডায়াগনস্টিক, হিস্টোপ্যাথলজি, সাইটোপ্যাথলজি, বোন ম্যারো বা বায়োপসি রিপোর্টসহ প্রযোজ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন।
কিডনি রোগ: রক্তে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষার রিপোর্ট। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং চিকিৎসকের সনদ।
লিভার সিরোসিস: লিভারের আল্ট্রাসনোগ্রাম, ফাইব্রোস্ক্যানসহ প্রাসঙ্গিক পরীক্ষার প্রতিবেদন।
প্যারালাইসিস: রোগের ধরন অনুযায়ী এমআরআই, সিটি স্ক্যান বা গ্রহণযোগ্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণপত্র।
হৃদ্রোগ: এনজিওগ্রাম, ইকোকার্ডিওগ্রামসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার প্রতিবেদন।
লিউকেমিয়া ও থ্যালাসেমিয়া: রোগ শনাক্তকরণ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষার প্রতিবেদন, যেমন হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস।
রোগভেদে ঠিক কোন কোন রিপোর্ট এবং কী ধরনের সত্যায়ন লাগবে, তা আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা কার্যালয় থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত।
যেভাবে আবেদন করবেন
সরকারি এ সহায়তা পেতে প্রথমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনলাইন সেবা পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে নির্ধারিত আবেদন ফরমে রোগীর তথ্য, পরিচয়, চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য দিতে হবে।
আবেদনপত্র পূরণের পর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হবে। অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন হলে আবেদনপত্রের প্রিন্টকপি ও প্রয়োজনীয় নথি সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে জমা দিতে হবে—তবে জমা দেওয়ার পদ্ধতি ও অতিরিক্ত নথির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
অনলাইন আবেদনের সরকারি পোর্টাল:
“সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ইন্টিগ্রেটেড ডিজিটাল সার্ভিস ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম” (https://msw.gov.bd/)
আগের আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবেদন করেও যাঁরা আর্থিক সহায়তার অর্থ পাননি, তাঁদের অপেক্ষমাণ আবেদন নতুন অর্থবছরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তর করা হবে না। তাঁদের ২০২৬ সালের সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী নতুন করে আবেদন করতে হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে আগের অর্থবছরে আবেদন করা থাকলেও নতুন করে আবেদন করার প্রস্তুতি নিতে হবে।
সরকারের এ উদ্যোগের মাধ্যমে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত অসচ্ছল রোগীরা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে আর্থিক সহায়তা পাবেন। তবে আবেদন করলেই অনুদান নিশ্চিত নয়; নির্ধারিত শর্ত পূরণ এবং কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত রোগীদেরই এ সহায়তা দেওয়া হবে।






















