ঢাকা ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
পাঠাওয়ের ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁসের দাবি, চাওয়া হয়েছে ৪ লাখ ডলার গণমাধ্যম শুধু খবরের বাহক নয়, জাতির বিবেক ও আয়না: জুবায়ের বাবু বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সেই মাহদীকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার গিয়াস উদ্দিন রিমন ডিএমপির দুই থানার ওসিসহ ৮ পুলিশ পরিদর্শককে বদলি চট্টগ্রামে পর্দা উঠল রাফি স্মৃতি মহানগর জুনিয়র ক্রিকেট লীগের কেরানীগঞ্জে কালিগঞ্জ জোড়া ব্রিজ সংলগ্ন মার্কেটে অ/গ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস দিনাজপুরে শিশু অধিকার দিবস ও বিশ্ব শিশু সপ্তাহ পালিত: বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তীতে বর্ণিল আয়োজন আক্কেলপুরে দুর্গাপূজার নিরাপত্তায়  আনসার-ভিডিপি সদস্য বাছাই মধুপুরে পুত্রবধূর ধাক্কায় বৃদ্ধ শ্বশুর আহত, থানায় অভিযোগ

গণমাধ্যম শুধু খবরের বাহক নয়, জাতির বিবেক ও আয়না: জুবায়ের বাবু

  • আপডেটের সময় : ০৩:৩২:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
  • ২৭ সময় দৃশ্য
৪৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ একটি জাতির সার্বভৌমত্ব কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, জীবনবোধ ও নিজস্ব সৃজনশীলতার মধ্যেই জাতির সার্বভৌম অস্তিত্ব গভীরভাবে নিহিত থাকে। এই সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন সময় টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও চিফ এডিটরিয়াল জুবায়ের বাবু।

 

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে ‘সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গণমাধ্যমের দায়িত্ব’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল ও পরিচয়-এর সহযোগিতায় এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সংস্কৃতির বহুমাত্রিক রূপ ব্যাখ্যা করে জুবায়ের বাবু বলেন, সংস্কৃতি কখনো স্থির নয়। সময়ের সঙ্গে তা বদলায়, নতুনকে গ্রহণ করে, পুরোনোকে নতুন করে আবিষ্কার করে এবং বিভিন্ন প্রভাবের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় সমৃদ্ধ হয়। তাই সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের অর্থ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত থেকেও নিজের পরিচয়, নিজস্বতা, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতার ওপর নিজস্ব অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা। তবে আজকের পৃথিবীতে এই কাজ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠিন।

তথ্যপ্রযুক্তির অবারিত প্রসারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একটি স্মার্টফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের গান, চলচ্চিত্র, মতাদর্শ ও জীবনধারা মানুষের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও বৈশ্বিক স্ট্রিমিং সেবা প্রতিদিন মানুষের জীবনযাত্রা ও রুচিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় মূল প্রশ্ন হলো: আমরা কি কেবল পরসংস্কৃতির ভোক্তা হয়ে থাকব, নাকি নিজেদের গল্প নিজেরা বলব এবং অন্যদের শোনাব ও দেখাব? জুবায়ের বাবুর মতে, নিজেদের গল্প নিজেরা বলা এবং দেশীয় সৃজনশীল শিল্পীদের ক্ষমতায়নই সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত।

জনমত গঠনে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না; মানুষের চিন্তা, রুচি, মূল্যবোধ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণেও ভূমিকা রাখে। একটি সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নেয়–কোন গল্প সামনে আসবে, কোন কণ্ঠ শোনা যাবে, কোন বিষয় প্রাধান্য পাবে আর কোনটি আলোচনার বাইরে থেকে যাবে। এভাবে গণমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার প্রতি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে দেয়। ফলে এই অপরিসীম ক্ষমতার সঙ্গে গভীর দায়িত্ববোধও যুক্ত থাকে।

সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের পরিধি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রাম, নদী, জনপদ, লোকসংগীত, লোকশিল্প, আঞ্চলিক ভাষা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, কারুশিল্প, স্থানীয় ইতিহাস ও প্রান্তিক মানুষের জীবন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ বর্তমানে গণমাধ্যমে সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা অধিকাংশ সময় শহরকেন্দ্রিক, এমনকি ঢাকাকেন্দ্রিক ও সীমিত পরিসরে আবদ্ধ থাকে। তাই এমন এক গণমাধ্যমের বিকাশ প্রয়োজন, যেখানে বাংলাদেশকে শুধু ঢাকা বা বড় শহরের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সমগ্র দেশের বহুমাত্রিক বাস্তবতার মধ্যদিয়ে দেখা যাবে।

দেশীয় শিল্পের মানোন্নয়নে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা কেবল স্লোগান দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য একটি শক্তিশালী সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা দরকার। মানসম্পন্ন গান, নাটক ও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি উন্নতমানের শিশুতোষ অনুষ্ঠান ও ইতিহাসভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে হবে। দেশীয় সাহিত্য ও লোককথাকে আধুনিক ভাষায় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।’

শিল্পী, শিক্ষক, নির্মাতা, সংগীতশিল্পী, অভিনেতা, চিত্রশিল্পী ও কনটেন্ট নির্মাতাদের কাজের সুযোগ ও পরিসর বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে জুবায়ের বাবু বলেন, দেশীয় সাংস্কৃতিক পণ্য মানসম্মত না হলে দর্শক-শ্রোতা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প কনটেন্টের দিকে ঝুঁকবে। সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে বড় কার্যকর প্রতিরক্ষা হলো গুণগত মান।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নৈতিকতার বিষয়ে জুবায়ের বাবু বলেন, সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার দোহাই দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা কোনো সমাধান নয়। বরং প্রাণবন্ত, স্বাধীন ও পেশাদার গণমাধ্যম সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত। তবে স্বাধীনতার পাশাপাশি সত্যনিষ্ঠ পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতাও জরুরি। ভুল তথ্য, গুজব, বিকৃত ইতিহাস, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অসহিষ্ণুতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভাজন কোনোভাবেই সাংস্কৃতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। স্বাধীনতা ও দায়িত্ব একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক।

ডিজিটাল মাধ্যমের রূপান্তরকে ইতিবাচকভাবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণরা এখন সংবাদপত্রের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় কাটায়, টেলিভিশনের চেয়ে মোবাইল স্ক্রিনে বেশি কনটেন্ট দেখে এবং প্রচলিত মাধ্যমের বাইরে গিয়ে নিজের মত প্রকাশ করে। এই বাস্তবতাকে ভয় না পেয়ে বুঝতে হবে এবং কাজে লাগাতে হবে। বাংলা ভাষায় উৎকৃষ্ট ডিজিটাল কনটেন্ট, অ্যানিমেশন, ওয়েব সিরিজ, পডকাস্ট, ডকুমেন্টারি ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের তরুণরা শুধু বিদেশি কনটেন্টের দর্শক হবে না। তারা বাংলাদেশের গল্পের নির্মাতাও হবে।’

বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতির সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভাষা আমাদের অস্তিত্ব, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গণমাধ্যমে শুদ্ধ, প্রাণবন্ত ও আধুনিক বাংলার ব্যবহার এবং নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার কার্যকর সংযোগ ঘটানো জরুরি। বাংলাকে কেবল আবেগের জায়গা থেকে নয়, জ্ঞান, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, ব্যবসা, বিনোদন ও সৃজনশীলতার ভাষা হিসেবেও শক্তিশালী করতে হবে।

ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জাতির ইতিহাস বিকৃত হলে তার আত্মপরিচয়ের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।’ মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনসহ জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো তথ্যনিষ্ঠ, গবেষণাভিত্তিক ও দায়িত্বশীলভাবে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। ইতিহাস নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, গবেষণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও আসতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাকৃত বিকৃতি, মিথ্যাচার বা অপতথ্যের ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সংস্কৃতিকে সার্বিক জাতীয় উন্নয়নের নিয়ামক হিসেবে আখ্যায়িত করে জুবায়ের বাবু বলেন, ‘সংস্কৃতি অর্থনীতি সৃষ্টি করে, সংস্কৃতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সংস্কৃতি পর্যটনকে শক্তিশালী করে। এ ছাড়া সংস্কৃতি দেশের ভাবমূর্তি গড়ে তোলে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব রাখে। বিশ্বে একটি দেশের সফট পাওয়ার অনেকাংশে নির্ভর করে তার সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও মানুষের গল্প বলার ক্ষমতার ওপর। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে।’

বিশ্বায়নের যুগে নিজস্ব অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে জুবায়ের বাবু বলেন, ‘সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব কোনো দেয়াল নয়, এটি একটি শক্তিশালী ভিত্তি। এই ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করা তত সহজ হবে। অন্যের সংস্কৃতিকে সম্মান করতে হলে আগে নিজের সংস্কৃতিকে জানতে ও সম্মান করতে হবে। বিশ্বায়নকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; নিজের পরিচয়কে শক্তিশালী করে সমমর্যাদায় তাতে অংশ নিতে হবে।’

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে আধুনিকতা থাকবে কিন্তু শিকড় হারাবে না। প্রযুক্তি থাকবে কিন্তু ভাষা হারাবে না। বিশ্বসংযোগ থাকবে কিন্তু নিজস্বতা হারাবে না।’

পরিশেষে জুবায়ের বাবু বলেন, ‘গণমাধ্যম শুধু খবরের বাহক নয়, গণমাধ্যম একটি জাতির স্মৃতি, বিবেক, আয়না এবং ভবিষ্যতের কণ্ঠস্বর। নিজের সংস্কৃতিকে জানা, নিজের গল্প বলা, নিজের সৃষ্টিকে শক্তিশালী করা এবং বিশ্বকে জানানো যে বাংলাদেশের একটি নিজস্ব কণ্ঠ আছে।’

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

পাঠাওয়ের ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁসের দাবি, চাওয়া হয়েছে ৪ লাখ ডলার

গণমাধ্যম শুধু খবরের বাহক নয়, জাতির বিবেক ও আয়না: জুবায়ের বাবু

আপডেটের সময় : ০৩:৩২:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
৪৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ একটি জাতির সার্বভৌমত্ব কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, জীবনবোধ ও নিজস্ব সৃজনশীলতার মধ্যেই জাতির সার্বভৌম অস্তিত্ব গভীরভাবে নিহিত থাকে। এই সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন সময় টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও চিফ এডিটরিয়াল জুবায়ের বাবু।

 

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে ‘সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গণমাধ্যমের দায়িত্ব’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল ও পরিচয়-এর সহযোগিতায় এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সংস্কৃতির বহুমাত্রিক রূপ ব্যাখ্যা করে জুবায়ের বাবু বলেন, সংস্কৃতি কখনো স্থির নয়। সময়ের সঙ্গে তা বদলায়, নতুনকে গ্রহণ করে, পুরোনোকে নতুন করে আবিষ্কার করে এবং বিভিন্ন প্রভাবের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় সমৃদ্ধ হয়। তাই সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের অর্থ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত থেকেও নিজের পরিচয়, নিজস্বতা, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতার ওপর নিজস্ব অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা। তবে আজকের পৃথিবীতে এই কাজ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠিন।

তথ্যপ্রযুক্তির অবারিত প্রসারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একটি স্মার্টফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের গান, চলচ্চিত্র, মতাদর্শ ও জীবনধারা মানুষের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও বৈশ্বিক স্ট্রিমিং সেবা প্রতিদিন মানুষের জীবনযাত্রা ও রুচিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় মূল প্রশ্ন হলো: আমরা কি কেবল পরসংস্কৃতির ভোক্তা হয়ে থাকব, নাকি নিজেদের গল্প নিজেরা বলব এবং অন্যদের শোনাব ও দেখাব? জুবায়ের বাবুর মতে, নিজেদের গল্প নিজেরা বলা এবং দেশীয় সৃজনশীল শিল্পীদের ক্ষমতায়নই সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত।

জনমত গঠনে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না; মানুষের চিন্তা, রুচি, মূল্যবোধ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণেও ভূমিকা রাখে। একটি সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নেয়–কোন গল্প সামনে আসবে, কোন কণ্ঠ শোনা যাবে, কোন বিষয় প্রাধান্য পাবে আর কোনটি আলোচনার বাইরে থেকে যাবে। এভাবে গণমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার প্রতি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে দেয়। ফলে এই অপরিসীম ক্ষমতার সঙ্গে গভীর দায়িত্ববোধও যুক্ত থাকে।

সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের পরিধি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রাম, নদী, জনপদ, লোকসংগীত, লোকশিল্প, আঞ্চলিক ভাষা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, কারুশিল্প, স্থানীয় ইতিহাস ও প্রান্তিক মানুষের জীবন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ বর্তমানে গণমাধ্যমে সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা অধিকাংশ সময় শহরকেন্দ্রিক, এমনকি ঢাকাকেন্দ্রিক ও সীমিত পরিসরে আবদ্ধ থাকে। তাই এমন এক গণমাধ্যমের বিকাশ প্রয়োজন, যেখানে বাংলাদেশকে শুধু ঢাকা বা বড় শহরের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সমগ্র দেশের বহুমাত্রিক বাস্তবতার মধ্যদিয়ে দেখা যাবে।

দেশীয় শিল্পের মানোন্নয়নে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা কেবল স্লোগান দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য একটি শক্তিশালী সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা দরকার। মানসম্পন্ন গান, নাটক ও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি উন্নতমানের শিশুতোষ অনুষ্ঠান ও ইতিহাসভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে হবে। দেশীয় সাহিত্য ও লোককথাকে আধুনিক ভাষায় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।’

শিল্পী, শিক্ষক, নির্মাতা, সংগীতশিল্পী, অভিনেতা, চিত্রশিল্পী ও কনটেন্ট নির্মাতাদের কাজের সুযোগ ও পরিসর বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে জুবায়ের বাবু বলেন, দেশীয় সাংস্কৃতিক পণ্য মানসম্মত না হলে দর্শক-শ্রোতা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প কনটেন্টের দিকে ঝুঁকবে। সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে বড় কার্যকর প্রতিরক্ষা হলো গুণগত মান।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নৈতিকতার বিষয়ে জুবায়ের বাবু বলেন, সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার দোহাই দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা কোনো সমাধান নয়। বরং প্রাণবন্ত, স্বাধীন ও পেশাদার গণমাধ্যম সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত। তবে স্বাধীনতার পাশাপাশি সত্যনিষ্ঠ পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতাও জরুরি। ভুল তথ্য, গুজব, বিকৃত ইতিহাস, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অসহিষ্ণুতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভাজন কোনোভাবেই সাংস্কৃতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। স্বাধীনতা ও দায়িত্ব একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক।

ডিজিটাল মাধ্যমের রূপান্তরকে ইতিবাচকভাবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণরা এখন সংবাদপত্রের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় কাটায়, টেলিভিশনের চেয়ে মোবাইল স্ক্রিনে বেশি কনটেন্ট দেখে এবং প্রচলিত মাধ্যমের বাইরে গিয়ে নিজের মত প্রকাশ করে। এই বাস্তবতাকে ভয় না পেয়ে বুঝতে হবে এবং কাজে লাগাতে হবে। বাংলা ভাষায় উৎকৃষ্ট ডিজিটাল কনটেন্ট, অ্যানিমেশন, ওয়েব সিরিজ, পডকাস্ট, ডকুমেন্টারি ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের তরুণরা শুধু বিদেশি কনটেন্টের দর্শক হবে না। তারা বাংলাদেশের গল্পের নির্মাতাও হবে।’

বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতির সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভাষা আমাদের অস্তিত্ব, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গণমাধ্যমে শুদ্ধ, প্রাণবন্ত ও আধুনিক বাংলার ব্যবহার এবং নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার কার্যকর সংযোগ ঘটানো জরুরি। বাংলাকে কেবল আবেগের জায়গা থেকে নয়, জ্ঞান, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, ব্যবসা, বিনোদন ও সৃজনশীলতার ভাষা হিসেবেও শক্তিশালী করতে হবে।

ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জাতির ইতিহাস বিকৃত হলে তার আত্মপরিচয়ের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।’ মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনসহ জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো তথ্যনিষ্ঠ, গবেষণাভিত্তিক ও দায়িত্বশীলভাবে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। ইতিহাস নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, গবেষণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও আসতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাকৃত বিকৃতি, মিথ্যাচার বা অপতথ্যের ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সংস্কৃতিকে সার্বিক জাতীয় উন্নয়নের নিয়ামক হিসেবে আখ্যায়িত করে জুবায়ের বাবু বলেন, ‘সংস্কৃতি অর্থনীতি সৃষ্টি করে, সংস্কৃতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সংস্কৃতি পর্যটনকে শক্তিশালী করে। এ ছাড়া সংস্কৃতি দেশের ভাবমূর্তি গড়ে তোলে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব রাখে। বিশ্বে একটি দেশের সফট পাওয়ার অনেকাংশে নির্ভর করে তার সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও মানুষের গল্প বলার ক্ষমতার ওপর। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে।’

বিশ্বায়নের যুগে নিজস্ব অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে জুবায়ের বাবু বলেন, ‘সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব কোনো দেয়াল নয়, এটি একটি শক্তিশালী ভিত্তি। এই ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করা তত সহজ হবে। অন্যের সংস্কৃতিকে সম্মান করতে হলে আগে নিজের সংস্কৃতিকে জানতে ও সম্মান করতে হবে। বিশ্বায়নকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; নিজের পরিচয়কে শক্তিশালী করে সমমর্যাদায় তাতে অংশ নিতে হবে।’

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে আধুনিকতা থাকবে কিন্তু শিকড় হারাবে না। প্রযুক্তি থাকবে কিন্তু ভাষা হারাবে না। বিশ্বসংযোগ থাকবে কিন্তু নিজস্বতা হারাবে না।’

পরিশেষে জুবায়ের বাবু বলেন, ‘গণমাধ্যম শুধু খবরের বাহক নয়, গণমাধ্যম একটি জাতির স্মৃতি, বিবেক, আয়না এবং ভবিষ্যতের কণ্ঠস্বর। নিজের সংস্কৃতিকে জানা, নিজের গল্প বলা, নিজের সৃষ্টিকে শক্তিশালী করা এবং বিশ্বকে জানানো যে বাংলাদেশের একটি নিজস্ব কণ্ঠ আছে।’