
মায়াজ হাওলাদার , কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ: মণ্ডপে দুর্গাপূজা নেই, অথচ সরকারি বরাদ্দ ৬০০ কেজি চাল। কোথাও পূজা না হলেও দায়িত্ব পালন করছেন ছয়জন আনসার সদস্য।
আবার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করেও বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কোনো কোনো মণ্ডপের সভাপতি। এমনকি সাত বছর আগে সভাপতির দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তির নামও রয়েছে সরকারি তালিকায়। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শারদীয় দুর্গাপূজার সরকারি বরাদ্দ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার তালিকা ঘিরে এভাবেই দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে উপজেলার একাধিক মন্দিরে এ বছর শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত না হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েকটি মন্দিরের নামে সরকারি চাল বরাদ্দ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কিছু মন্দিরের বরাদ্দের চাল উত্তোলনও করা হয়েছে। ফলে পূজা না হওয়া মন্দিরের নামে বরাদ্দের ভিত্তি কী ছিল, উত্তোলন করা চাল কোথায় ব্যবহার হয়েছে এবং তালিকা যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করেছেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলার পূর্ব তারাশী পান্ডেবাড়ি সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপের সভাপতি সত্য পান্ডে বলেন, ব্যাপক জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা পালন করেও তাঁরা সরকারি বরাদ্দ পাননি। অন্যদিকে কোটালীপাড়া পৌরসভার শুভঙ্কর দত্তের বাড়ি সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে এবার পূজা অনুষ্ঠিত হয়নি। মন্দিরটির সভাপতি শুভঙ্কর দত্ত বলেন, “আমার বাড়ির মণ্ডপে এ বছর দুর্গাপূজা হচ্ছে না। অথচ জানতে পেরেছি, মন্দিরের নামে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কীভাবে তালিকায় নাম এসেছে, তা জানি না। বরাদ্দ তুলতেও যাইনি।”
অনুসন্ধানে কলাবাড়ি, সাদুল্লাপুর ও বান্ধাবাড়ী ইউনিয়নসহ পৌর এলাকার একাধিক মণ্ডপে এ বছর শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন না হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কলাবাড়ি মধুবাড়ির বাড়ি সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপে গিয়ে পূজার কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। অথচ সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন ছয়জন আনসার সদস্য। পূজার আয়োজন না থাকলেও কেন সেখানে তাঁদের মোতায়েন করা হয়েছে, জানতে চাইলে আনসার দলের টিম লিডার কমলেশ রায় বলেন, “সরকারিভাবে আমাদের এখানে ডিউটি দেওয়া হয়েছে। এখন এখানে পূজা না হলে আমাদের কী করার আছে?”
উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা সোহেল রানা জানান, পূজামণ্ডপে আনসার সদস্য মোতায়েনের জন্য থানা থেকে তালিকা দেওয়া হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী আনসার সদস্য পাঠানো হয়। অর্থাৎ, পূজা না হওয়া মণ্ডপে নিরাপত্তার দায়িত্ব বণ্টনের তালিকা কীভাবে তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তালিকার উৎস ও যাচাইপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
সরকারি বরাদ্দের তালিকায় সভাপতির পরিচয় নিয়েও অসংগতি পাওয়া গেছে। কালীগঞ্জ বাজার সার্বজনীন দুর্গাপূজা মন্দিরের সভাপতি হিসেবে তালিকায় রয়েছে শরৎ চন্দ্র বালার নাম। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “সাত বছর আগে ওই মন্দিরের সভাপতি ছিলাম। এখনো সভাপতি হিসেবে তালিকায় আমার নাম কেন, বুঝতে পারছি না। এখানে চৈত্র মাসে বাসন্তী পূজা হয়। বরাদ্দের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”
একইভাবে পূর্ব বান্ধাবাড়ি ঠাকুরবাড়ি সার্বজনীন মন্দিরের সভাপতি হিসেবে তালিকায় রয়েছে দুলাল কৃষ্ণের নাম। তাঁর ভাতিজা নিহার জানান, তাঁদের মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা হয় না; চৈত্র মাসে বাসন্তী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর ভাষ্য, গত বছরও মন্দিরটির নাম বরাদ্দের তালিকায় ছিল, তবে তাঁরা বরাদ্দ উত্তোলন করেননি। সে বছর আনসার সদস্য পাঠানো হলেও তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবার আনসার সদস্য পাঠানো হয়নি। তবে তালিকায় মন্দিরটির নাম থাকার কারণ তাঁরা জানেন না।
অবশ্য সব মন্দিরের ক্ষেত্রে বরাদ্দ না তোলার কারণ একই নয়। উপজেলার লাখিরপাড় পশ্চিমকান্দি সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের সভাপতি চিত্তরঞ্জন মণ্ডল জানান, পূজার ব্যস্ততার কারণে তাঁরা নির্ধারিত সময়ে সরকারি বরাদ্দ সংগ্রহ করতে পারেননি। তাঁর দাবি, প্রতিবছরই তাঁরা পূজার পরে বরাদ্দ নিতে যান। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আনসার আলীর তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা থেকে ৩১৫টি মন্দিরের নাম দুর্গাপূজার অনুদানের জন্য পাঠানো হয়েছিল। পূজার আগে সোমবার (১৯ অক্টোবর) শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত ২৯টি মণ্ডপের পক্ষ থেকে বরাদ্দ সংগ্রহ করতে কেউ আসেননি।
বরাদ্দের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আনসার আলী বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে মন্দিরের তথ্য সংগ্রহ করে বরাদ্দের জন্য জেলা পরিষদ কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী বরাদ্দের চাহিদা পাঠানো এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তিনি আরও জানান, পরবর্তী সময়ে আরও আটটি মন্দিরের তালিকা পাওয়া যায়। সেগুলোর জন্যও বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। তবে ওই মন্দিরগুলোর বিপরীতে বরাদ্দ অনুমোদন না হলেও অনুদান হিসেবে কিছু টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল-আরেফিন বলেন, “সরকারি বরাদ্দ শারদীয় দুর্গাপূজার জন্য। এই সময় ব্যতীত অন্য সময়ের কোনো পূজার জন্য বরাদ্দ নয়। যদি কেউ এ সময়ে পূজার অনুষ্ঠান না করে অন্য সময়ের জন্য বরাদ্দ নিয়ে থাকেন, তাহলে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।



















