ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রোধে হাইকোর্ট সাতদফা নির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রকাশিত: ৪:৪৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২০

ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রোধে  হাইকোর্ট সাতদফা নির্দেশনা দিয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক:ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রোধে হাইকোর্ট সাতদফা নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তির (অফিস স্টাফ) নাম, পদবী ও মোবাইল ফোন নম্বরসহ সীল ও তার সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে পরোয়ানার সঠিকতা নিয়ে সন্দেহ হলে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে তার সঠিকতা নিশ্চিত হওয়া যায়। একইসঙ্গে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার আগে পুলিশ সুপার বা সংশ্লিষ্ট থানা কর্মকর্তাকে পরোয়ানার সত্যতা নিশ্চিত হতে বলা হয়েছে।

আদেশের কপি দেশের অধস্তন সকল আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, কারা মহাপরিদর্শক ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার এ আদেশ দেন। ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় আশুলিয়ার মির্জানগর এলাকার টাকসুর গ্রামের নূর মোহাম্মদের ছেলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কৃষি বিভাগের প্রোগ্রাম কর্মকর্তা মো. আওলাদ হোসেনকে গ্রেপ্তারের বৈধতা নিয়ে করা এক রিট মামলায় এ নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। তবে এ বিষয়ে জারি করা রুল নিষ্পত্তির জন্য অন্য কোনো আদালতে উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে। রিট আবেদনকারীপক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও এমাদুল হক বসির।

হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো হলো

১. (ক) যে ব্যক্তি পরোয়ানা কার্যকর করবেন, তার নাম, পদবী ও ঠিকানা সুনির্দিষ্টভাবে পরোয়ানায় উল্লেখ করতে হবে। (খ) যার প্রতি পরোয়ানা জারি করা হচ্ছে তার নাম ও ঠিকানা, মামলার নম্বর ও ধারা (জি আর/নালিশী মামলার নম্বর) সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। (গ) সংশ্লিষ্ট জজ (বিচারক)/ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরের নিচে নাম ও পদবীর সীল থাকতে হবে। (ঘ) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তির (অফিস স্টাফ) নাম, পদবী ও মোবাইল ফোন নম্বরসহ সীল ও তার সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর ব্যবহার করতে হবে। যাতে পরোয়ানার সঠিকতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহের সৃষ্টি হলে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে তার সঠিকতা নিশ্চিত হওয়া যায়।

২. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুতের পর তা সংশ্লিষ্ট পিয়নবহিতে এন্ট্রি করে বার্তা বাহকের মাধ্যমে তা পুলিশ সুপারের কার্যালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠাতে হবে। পরোয়ানা পাবার পর পিয়নবহিতে স্বাক্ষর করে পুলিশ সুপারের কার্যালয়/থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তা বুঝে নেবে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রেরণ ও কার্যকর করার জন্য পর্যায়ক্রমে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার কাজে লাগানো যেতে পারে।

৩. স্থানীয় অধিক্ষেত্রের বাহিরের কোনো জেলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষেত্রে পরোয়ানা জারিকারী কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সীলগালা করে এবং অফিসের সীলমোহর ছাপ দিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠাবেন।

৪. সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতা সীল মোহরকৃত খাম খুলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পরীক্ষা করে উহার সঠিকতা নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবেন। তবে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ক্ষেত্রে সন্দেহ দেখা দিলে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তার সঠিকতা নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবেন।

৫. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাওয়ার পর তা কার্যকর করার আগে পরোয়ানা গ্রহণকারী কর্মকর্তাকে পরোয়ানার সত্যতা নিশ্চিত হতে হবে। এ সময় কোনো সন্দেহের সৃষ্টি হলে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তার সঠিকতা নিশ্চিত হয়ে পরোয়ানা কার্যকর করতে হবে।

৬. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুসারে আসামি/আসামিদের গ্রেপ্তারের পর তাদের আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিকটস্থ আদালতে পরোয়ানাসহ উপস্থাপন করতে হবে। আদালত আসামি/আসামিদের জামিন না দিলে আদেশের কপিসহ তাদের জেলহাজতে পাঠাতে হবে। ক্ষেত্রমত সম্পূরক নথি তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিকারী আদালতে পাঠাতে হবে।

৭. সংশ্লিষ্ট আসামি/আসামিদের কোন থানার কোন মামলায়, কোন আদালতের আদেশে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে তা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিকারী আদালতকে জানাবেন সংশ্লিষ্ট জেল সুপার কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। পরবর্তীতে আর কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাওয়া গেলে তা নিশ্চিত হয়ে কার্যকর করবেন জেল সুপার।

পুলিশ আওলাদ হোসেনকে গতবছর ৩০ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের এক মামলায়। অথচ এর কয়েকদিন পর গতবছর ১৩ নভেম্বর কক্সবাজার আদালত থেকে দেওয়া এক আদেশে বলা হয়, ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ভুয়া। এরপর ওই আদালত তাকে জামিন দেয়। এরপর আরেক পরোয়ানায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ওই বছরের ২৪ নভেম্বর রাজশাহী আদালতে হাজির করা হলে ওই আদালত তাকে জামিন দেয়। দেখা যায়, ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ভুয়া। এবার তাকে কারা কর্তৃপক্ষের হাতে আসে বাগেরহাট আদালতের এক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। কিন্তু গতবছর পহেলা ডিসেম্বর বাগেরহাট আদালত থেকে দেওয়া আদেশে বলা হয়, ওই আদেশ তাদের নয়। এবার শেরপুরের ঠিকানা দিয়ে কারাগারে আসে আরেক পরোয়ানা। এই পরোয়ানামূলে আওলাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখায় কারা কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় আওলাদ হোসেনের আটক রাখা নিয়ে রিট করেন তার স্ত্রী শাহনাজ পারভীন। এ রিট আবেদনে আদালত আওলাদ হোসেনকে হাইকোর্টে হাজির করার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সত্যতা যাচাই করে তাকে জামিন দিতে শেরপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেন। এর বাইরে আর কোনো পরোয়ানা থাকলে তা যাচাই সাপেক্ষে মুক্তির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এছাড়া ভুয়া পরোয়ানার ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি রুল জারি করা হয়। এ আদেশের পর আওলাদ হোসেনকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট ৭ দফা নির্দেশনা দিলেন।


মুজিব বর্ষ

Pin It on Pinterest