ঢাকা ৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১ পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:৩৬ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৪, ২০২৬
মোঃ নেছার উদ্দিন
কমরেড আব্দুল হালিম (১৯৪৮-২০২২) ছিলেন বরগুনা জেলার একজন আজীবন বিপ্লবী, নিবেদিতপ্রাণ জননেতা এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বরগুনা জেলা কমিটির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রাক্তন সদস্য। ৪ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে ঢাকার ডেল্টা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার চলে যাওয়া ছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং বরগুনার আপামর জনসাধারণের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
১৯৪৮সালের ১ এপ্রিল বর্তমান বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার বলইবুনিয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কমরেড আব্দুল হালিম। তার পিতা মরহুম হেমায়েত হোসেন মৃধা এবং মাতা মরহুম জমরুত বেগম। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। শৈশবে তিনি গ্রামের বুড়ামজুমদার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং কাউনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। নবম শ্রেণিতে তিনি বামনা উপজেলার বামনা সরওয়ারজান পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাশ করেন। এরপর তিনি বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন, যা তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা বিন্দু হয়ে ওঠে।
কলেজে পড়াকালীনই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন এবং ১৯৬৯ সালের আইয়ুব বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই সময়েই তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং শ্রেণিসংগ্রামের আদর্শে দীক্ষিত হন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি তৎকালীন বরগুনা মহকুমার অন্তর্গত বামনা থানার দক্ষিণ অঞ্চল, সমগ্র পাথরঘাটা থানা এবং পিরোজপুর মহকুমার মঠবাড়িয়া থানা নিয়ে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে তিনি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ কর্মীদেরও তার বাহিনীতে সাদরে গ্রহণ করেন, যা তার অসাম্প্রদায়িক এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম চেতনার পরিচায়ক। কমরেড হালিম বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি জনযুদ্ধ, যেখানে আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণই বিজয়ের মূল চাবিকাঠি। প্রাথমিক দিকে তার অস্ত্রের যোগান আসে স্বরূপকাঠি থানার আটঘর কুড়িয়ানার পেয়ারা বাগানে পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে এক খণ্ডযুদ্ধের পর পাকিস্তানপন্থীদের পরাজিত হয়ে রেখে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র থেকে। তিনি তৎকালীন বরিশাল জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি কমরেড আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করে সকল বামপন্থী নেতাকর্মীদের সাথে একত্রিত হয়ে মুক্তিবাহিনী গড়ার প্রস্তাব দেন। ছাত্র ইউনিয়ন এবং ন্যাপ তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করে একসাথে কাজ করার সম্মতি জ্ঞাপন করে, যা মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে বামপন্থীদের সাহসী ভূমিকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তিনি কেবল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, একজন মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক হিসেবেও তার অবদান ছিল অপরিসীম। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহস যুগিয়েছেন এবং সংগঠিত করেছেন।
কমরেড আব্দুল হালিম ছিলেন একজন সৎ, আদর্শবান, সদালাপী, বিনয়ী স্বভাবের এবং পরোপকারী মানুষ। জনসেবাই ছিল তার জীবনের ব্রত। তিনি উপকূলীয় জনপদের উন্নয়নে আজীবন কাজ করে গেছেন। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক-শো অনুষ্ঠানে তিনি উপকূলীয় এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো স্পষ্ট ও যুক্তিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ধন-সম্পদের প্রতি তার কোনো মোহ ছিল না। তিনি ছিলেন নির্লোভী এবং মাটির মানুষ। মৃত্যুর পূর্বে তিনি বরগুনার পৈতৃক ভিটার যেটুকু অংশ তার ছিল, তা তার ভাইদের মধ্যে বুঝিয়ে দেন, যা তার ত্যাগের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। নিজ সম্পদ বলে তার যা কিছু ছিল, তা ছিল কেবল মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা।
বিশেষ করে এলাকার অসহায় ও গরিব মানুষদের চিকিৎসা সেবায় তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনেক অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেন, চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতেন এবং তাদের সুস্থ করে তোলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। তার বাড়িতে দিনরাত মানুষের ভিড় লেগেই থাকত, কারণ তিনি ছিলেন এলাকার দুঃখী মানুষের ভরসার আশ্রয়স্থল।
কমরেড আব্দুল হালিম দীর্ঘদিন ধরে লিভার, গ্যাস্ট্রিক-আলসাসহ নানাবিধ জটিল রোগে ভুগছিলেন। কিন্তু অসুস্থতা তাকে তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও এক ছেলেসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করে।
কমরেড আব্দুল হালিম স্মরণে তার বিপ্লবী জীবন, জনসেবা এবং ত্যাগের আদর্শ যুগ যুগ ধরে সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। বরগুনার এই বিপ্লবী জননেতা তার কর্মের মধ্য দিয়েই মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।
লেখক: মোঃ নেছার উদ্দিন, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সাগরকূল, বরগুনা।


© স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২০ Developed By Agragami HOST