আগের মতো আর চোখে পড়ে না গাছিদের ছুটোছুটি

প্রকাশিত: ২:৪৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২০

আগের মতো আর চোখে পড়ে না গাছিদের ছুটোছুটি

মোঃ ফিরোজ হোসেন নওগাঁ প্রতিনিধি : নওগাঁর আত্রাই উপজেলা থেকে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে পিঠা-পায়েশের ঐতিহ্য। খেজুর গাছ সংকটে এখন আর গাছিদের আগের মতো ছুটাছুটিও নেই। ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আগে এই শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রাম-গঞ্জে খেজুরের গাছ কেঁটে রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা ব্যস্ত সময় পার করতেন। এখন আর আগের মতো গাছিদের ছুটাছুটির দৃশ্য চোখে পড়ে না। সড়কের দু’ধারে সারি সারি খেজুর গাছ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। বিকেল বেলায় গাছ কাটা গাছে হাড়ি দিয়ে যেত গাছিরা। আবার সকালে সূর্য উঠার সাথে সাথেই রস আহরণ করে গাছ থেকে নামাতো। অনেক হাড়ি ভর্তি হয়ে রস গাছের নিচে পড়ে রসে ভিজে থাকত ঐ গাছের নিচের জায়গা। ঐ দৃশ্যও এখন বিরল। হাট-বাজারে বিক্রি হতো সুস্বাদু এই খেজুরের রস। এই মৌসুমেই আমন ধান কাটার পর গৃহবধূরা এই ধানের চাল থেকে ঢেঁকি ছেঁটে চালের আটা ও এই রস দিয়ে হরেক রকমের পিঠা-পায়েশ তৈরিও করত। আবার অনেকেই মেয়ে জামাইকে দাওয়াত দিয়ে পিঠা পায়েসে আপ্যায়ন করত। তাও আর চোখে পড়ে না। এখনো বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের দূরে দূরে অবস্থিত যে হাতে গোনা খেজুরের যে গাছগুলো রয়েছে তাও অপ্রতুল। তাইতো আগের মতো আর মাঠজুড়ে খেজুর গাছ না থাকায় মৌসুমের রস সংগ্রহে গাছ কাটা ও গাছ ছাঁচাসহ বিভিন্ন পরিচর্যায় ব্যস্ত গাছিদের ছোটাছুটির তেমন দৃশ্য চোখে পড়ে না। তবে গাছিদের রস সংগ্রহ করতে দেখা গেলেও সকালে দেখা মিলছে না রস বিক্রেতাদের। উপজেলায় প্রায় অর্ধশতাধিক গাছি পুরো বছরের খাবার জোগাড় করত এ পেশা থেকে। আগে যেসব গুড় ব্যবসায়ীরা খেজুরের রস থেকে গুড় বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাত। রসের স্বল্পতার কারণে এখন তারা রস দিয়ে গুড় তৈরি করতে পারছে না। এক সময় উপজেলার খেজুর গাছের রস ছিল এ মৌসুমের প্রধান ঐতিহ্য। তার মধ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ গাছ ছিল অসংখ্য। কিন্তু এখন তা সম্পূর্ণ উল্টো। এর কারণ অনুসন্ধান করে জানা গেছে, এ উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে ইটভাটা থাকায় প্রতিদিন সেখানে হাজার হাজার খেজুরের গাছ এই শীত মৌসুমেই পোড়ানো হয়। এ কারণে খেজুর গাছ হারিয়ে যাওয়ায় আজ সব ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে। খেজুরের রস উপজেলাবাসীর জন্য এখন স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এব্যাপারে গাছি উপজেলা সদরের সিংসাড়া মৃত- আবেদ আলীর পুত্র শুকুর আলী (৫২), সাহাগোলা ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের আফছার প্রামাণিকের পুত্র গাছি সোলেমান (৪০) জানান, খেজুর গাছের চাহিদা ইটভাটায় বেশি হওয়ায় তুলনামূলক দামও বেশি পাওয়ায় মানুষ দেদার খেজুর গাছগুলো বিক্রি করছে। ইটভাটার মালিকরাও অধিক মুনাফার আশায় কয়লার পরিবর্তে এই খেজুর গাছ ভাটায় পুড়ছে। ফলে খেজুর গাছের সংকট দেখা দিয়েছে। এতকিছুর মাঝেও যে কয়টি গাছ আছে তা থেকে রস সংগ্রহের কাজ তারা করছেন। তারা আরো জানান, আগে এ মৌসুমে ৪০থেকে ৫০ মণ গুড় তৈরি করে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাত। এখন গাছ কমে যাওয়ায় যে রস পায় তা দিয়ে পরিবারের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। এক সময় শীতের এই সকালে রস বিক্রিতারা ভাঁড় বাঁশে হাঁড়ি কাধে নিয়ে খেজুরের রস বিক্রি করত। কালের বিবর্তনে এখন আর সেই দৃশ্য আগের মতো চোখে পড়ে না। শীতের সকালে গ্লাস ভরে খেজুরের রস খাওয়াই ছিল লোভনীয়। এছাড়াও খেজুর রসের গুড় পাটালির চাহিদা এখনো রয়েছে। শীতের তীব্রতা যত বাড়বে তার সাথে সাথেই প্রতিটি ঘরে ঘরে খেজুরের রস দিয়ে পিঠা-পুলি আর পায়েশ তৈরির ধুম পড়বে। চিড়া মুড়ি পিঠা খাওয়া কৃষক পরিবার থেকে শুরু করে সবার কাছে প্রিয়। শীত মৌসুম এলেই উপজেলার সর্বত্র শীত উদযাপনের নতুন আয়োজন শুরু হয়। তাইতো শীত মৌসুমের শুরুতেই এলাকার গাছিরা খেজুরের গাছ থেকে ছাল তোলা-চাঁছা আর কাটাসহ নলি বসানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করে। এ সময় এলাকার গাছিদের মুখে ফুটে উঠে রসালো হাসি। খেজুরের গাছ কমে যাওয়ায় খেজুরের রসের আকাল দেখা দিয়েছে। ফলে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে পিঠা-পায়েশ খাওয়ার খেজুরের রস।


মুজিব বর্ষ

Pin It on Pinterest